৭ মাসে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমেছে ১.৩১ কোটি

সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমেছে। শুধু এবছর জানুয়ারি মাসেই কমেছে প্রায় ১০ লাখ গ্রাহক। এই সংখ্যা চিন্তার বিষয়, কারণ ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কী কারণে এত ব্যবহারকারী কমে গেল? এবং এর ফলে ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? আজকের আলোচনায় এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক কমার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো সিমের ওপর কর বৃদ্ধি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে সরকার সিমের ওপর কর ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করেছে। এর ফলে মোবাইল অপারেটররা নতুন সিম বিক্রিতে আগের মতো ভর্তুকি দিতে পারছে না। আগে বাংলালিংক ও রবির মতো কিছু অপারেটর গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কম দামে সিম বিক্রি করতো বা কখনো বিনামূল্যেও দিত। কিন্তু কর বৃদ্ধির কারণে তারা এখন সেই সুবিধা দিতে পারছে না। বাংলালিংকের করপোরেট প্রধান তাইমুর রহমান বলেছেন, “কর বৃদ্ধির ফলে মোবাইল অপারেটরদের জন্য আগের মতো সিম বিক্রিতে ভর্তুকি দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।” তিনি আরও জানান, বড় টেলিকম কোম্পানিগুলো ভর্তুকি বহন করতে পারলেও ছোট অপারেটরদের জন্য এটি কঠিন, যা প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট করছে।
এছাড়া, দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমার আরেকটি বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মানুষ তাদের অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে আনছে। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার অনেকের জন্য বিলাসিতা হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেকেই ইন্টারনেট খরচ সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক মানুষ একাধিক সিম ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যা কমে গেছে।
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ই-কমার্স এবং অনলাইন ব্যবসার ওপর। বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর জানান, মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে ই-কমার্স খাতে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, “গত এক বছর ধরে আমাদের প্ল্যাটফর্মে নতুন ব্যবহারকারী বাড়াতে বেশ কষ্ট করতে হচ্ছে।” ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনলাইনে কেনাকাটা কমে গেছে, কারণ অনেক গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ কমানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন পরিষেবার উপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
তবে, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার কমার পাশাপাশি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার কিছুটা বেড়েছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ লাখ বেড়ে বর্তমানে ১ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছেছে। জানুয়ারি পর্যন্ত মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড মিলিয়ে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি। যদিও এই বৃদ্ধিটা তুলনামূলকভাবে ছোট, তবে এটি ডিজিটাল কানেক্টিভিটির একটি ইতিবাচক দিক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পের অগ্রগতি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সরকার যদি সিমের ওপর ট্যাক্স কিছুটা কমায়, তাহলে গ্রাহকরা নতুন সিম কিনতে আগ্রহী হবে এবং মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার আবার বাড়তে পারে। এছাড়া, মোবাইল অপারেটররা যদি গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী ডাটা প্যাকেজ নিয়ে আসে, তাহলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা কমার হার কিছুটা কমানো যেতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান করাও জরুরি। মানুষের হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে তারা ইন্টারনেটসহ অন্যান্য খরচ কমিয়ে দেবে, যা ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সরকার ও টেলিকম অপারেটরদের উচিত একসঙ্গে কাজ করে এমন কিছু নীতি গ্রহণ করা, যা সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আরও সহজলভ্য করে তুলবে।