টেকসই পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়ের দাবি

টেকসই পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়ের দাবি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো পোশাক শিল্প। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে পোশাক খাতকে অনেক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, টেকসই উৎপাদনের চাহিদা—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিল্প মালিকরা এখন একটাই দাবি তুলেছেন। পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।

কিন্তু কেন এই দাবি? কীভাবে একটি আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করলে পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব? এই বিষয়েই জানবো আজকের লেখাতে।

সম্প্রতি, রাজধানীর কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বিজিএমইএ নির্বাচনী জোট-ফোরামের উদ্যোগে এক বিশেষ আলোচনা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পোশাক শিল্পের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত দেন।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন, একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠিত হলে পোশাক খাতের সমস্যা দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে।

ফোরাম প্যানেলের লিডার মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন— “নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পোশাক খাতের জন্য নীতি সহায়তা জরুরি। সব সময়ই দেখা যায়, এই খাত নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হয়। শ্রমিক অসন্তোষের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়, যার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ থাকতে পারে। অথচ শ্রমিকরা কখনোই তাদের নিজেদের রুটিরুজি নষ্ট করতে চাইবে না। এছাড়া, কাস্টমসের হয়রানি থেকে উদ্যোক্তাদের রেহাই দিতে হবে, যাতে তারা ব্যবসা সহজে চালিয়ে যেতে পারেন।”

বক্তারা আরও বলেন, পোশাক শিল্পের নেতৃত্বে যারা আসবেন, তাদের শুধু কার্ডধারী পরিচালক হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতা হতে হবে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমান সিনহা বলেন—“সরকার ব্যবসা বোঝে না, সরকারকে বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে বিজিএমইএকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক ব্যবসার যে সমস্যা রয়েছে, সেগুলো ঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে যথাযথ সমাধান পাওয়া যায়।”

আরেক সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী মনে করেন, বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে বিজিএমইএর নেতৃত্ব আরও দক্ষ হতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আলাদা মন্ত্রণালয় থাকলে পোশাক খাতের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত ও কার্যকর হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় এই শিল্প শ্রম মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু যথাযথ গুরুত্ব পায় না, যা ব্যবসায়িক পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে।

একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় থাকলে বেশ কিছু জিনিস সহজ হতে পারে। যেমন—

  • নীতিগত সহায়তা দ্রুত ও কার্যকর হবে।
  • শ্রমিকদের কল্যাণে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হবে।
  • বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যাবে।
  • কাস্টমস ও অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতা সহজে সমাধান করা সম্ভব হবে।
  • আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন—“পোশাক শিল্পের মালিকরা বহু বছরের জঞ্জাল থেকে মুক্তি চান। বিজিএমইএর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে নানা সময়ে। এবার আমাদের প্রয়োজন স্বচ্ছ একটি ভোট, যাতে সংগঠনটি তার হারানো ভাবমূর্তি ফিরে পায়। তাছাড়া, কোনো কারখানা যদি ব্যবসা চালিয়ে যেতে না পারে, তবে তার জন্য একটি পরিকল্পিত ‘এক্সিট পলিসি’ থাকা উচিত।”

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শুধু দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। এই খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে নীতিগত সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

শিল্প মালিকদের দাবি অনুযায়ী, যদি আলাদা একটি মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়, তাহলে এই খাতের সমস্যা আরও দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই দাবির প্রতি কতটা গুরুত্ব দেয় এবং কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *