ইস্পাহানি গ্রুপের ২০০ বছরের সাম্রাজ্য কি ভাঙতে চলেছে?

বাংলাদেশের ব্যবসা জগতের ইতিহাসে কিছু নাম প্রায় চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে একটি হলো ইস্পাহানি গ্রুপ। ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পরিবার-নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি দেশের অর্থনীতি ও শিল্পের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন উঠেছে—এই সুপ্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য কি সংকটে পড়েছে? বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজার, পরিবর্তিত ভোক্তা চাহিদা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কি ইস্পাহানি গ্রুপকে টিকে থাকতে দেবে?
আজকে আমরা জানবো, কীভাবে ইস্পাহানি গ্রুপ এই দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছে, এবং ভবিষ্যতে তারা কি আদৌ সেই আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে?
ইস্পাহানি গ্রুপের ইতিহাস
ইস্পাহানি গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় ১৮২০ সালে, যখন হাজী মোহাম্মদ হাশেম ইরানের ইস্পাহান থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতে আসেন। প্রথমে তিনি বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) এবং পরে কলকাতায় ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে এবং পরে ব্রিটিশ ভারতে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারে পরিণত হয়।
১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের পর, ইস্পাহানি পরিবার চট্টগ্রামে তাদের ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র স্থানান্তর করে। এরপর থেকে, ইস্পাহানি গ্রুপ ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।
চা শিল্পে ইস্পাহানি গ্রুপের আধিপত্য
ইস্পাহানি গ্রুপের সবচেয়ে পরিচিত পণ্য হল চা। তাদের ‘মির্জাপুর’ ব্র্যান্ড বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পরিচিত। ইস্পাহানি বর্তমানে দেশের ব্র্যান্ডেড চা বাজারের প্রায় ৫০% এবং চা-ব্যাগ বাজারের ৮০% নিয়ন্ত্রণ করে।
তারা নিজেরাই চা উৎপাদন করে এবং গুণগত মান বজায় রাখে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের একটি অন্যতম কারণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চা বাজারে বেশ কয়েকটি নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী এসেছে, যেমন টেটলি, লিপটন এবং স্থানীয় বেশ কিছু ব্র্যান্ড। তাই প্রশ্ন উঠছে, ইস্পাহানির আধিপত্য কি আগামী দিনে টিকে থাকবে?
বিভিন্ন শিল্পে ইস্পাহানির বিনিয়োগ
চা শিল্পের বাইরেও ইস্পাহানি গ্রুপের ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে। তারা খাদ্য, কৃষি, টেক্সটাইল, শিপিং, রিয়েল এস্টেট এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
শুধু চায়েই নয়, ইস্পাহানি গ্রুপ খাদ্য শিল্পেও ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। আটা-ময়দা, ডাল, মসলা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদনে তারা শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দেশের টেক্সটাইল খাতেও তাদের বিনিয়োগ রয়েছে, যা রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
শিপিং ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসাতেও ইস্পাহানি গ্রুপ সক্রিয়। তারা দেশের অন্যতম বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর একটি পরিচালনা করছে, যা আমদানি-রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া, ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল দেশের অন্যতম বৃহৎ চক্ষু হাসপাতাল, যা ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সংকট
একটি প্রতিষ্ঠান যখন দুই শতাব্দী ধরে বাজারে টিকে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এটি নানা রকম সংকট ও প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়। ইস্পাহানি গ্রুপও এর ব্যতিক্রম নয়।
বর্তমানে বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে গেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সংখ্যা বাড়ায় ইস্পাহানির জন্য ব্যবসায় টিকে থাকা আগের মতো সহজ নয়। বিশেষ করে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিক মার্কেটিং কৌশল অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
এছাড়া, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও মূল্যস্ফীতি ইস্পাহানির ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা ইস্পাহানির মতো বড় প্রতিষ্ঠানের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, ইস্পাহানি গ্রুপ এখন নতুন প্রজন্মের হাতে যাচ্ছে। পারিবারিক ব্যবসায় সাধারণত উত্তরাধিকারের পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন প্রজন্ম কি প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি নেতৃত্বের দুর্বলতা ইস্পাহানির সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে তুলবে?
ইস্পাহানি গ্রুপের ভবিষ্যৎ কেমন হবে?
যদি ইস্পাহানি গ্রুপ বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতেও তারা টিকে থাকবে। তবে এর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা জরুরি।
নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে, যাতে উৎপাদন খরচ কমে এবং পণ্যের মান উন্নত হয়। তরুণ প্রজন্মের ভোক্তাদের আকর্ষণ করার জন্য আধুনিক মার্কেটিং কৌশল গ্রহণ করতে হবে। শুধু চা নয়, নতুন নতুন পণ্য ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে একাধিক খাতে তাদের শক্ত অবস্থান থাকে।
ইস্পাহানি যদি এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে হয়তো আগামী আরো কয়েক দশক ও তারা বাজারের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পারবে।
উপসংহার
২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইস্পাহানি গ্রুপ তাদের প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে আছে। নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে, তবে ইতিহাস বলছে, তারা সবসময় সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠান আমাদের শেখায় যে, বাজার পরিবর্তিত হলেও অভিযোজন ক্ষমতা থাকলে টিকে থাকা সম্ভব।
আপনার কী মনে হয়? ইস্পাহানি কি ভবিষ্যতে টিকে থাকবে নাকি প্রতিযোগিতার চাপে হারিয়ে যাবে?