নতুন বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জের মাঝেও এগিয়ে চলেছে আবুল খায়ের গ্রুপ

নতুন বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জের মাঝেও এগিয়ে চলেছে আবুল খায়ের গ্রুপ

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে, যখন বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দেখা দেয়। কিন্তু এমন সময়েও কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের সম্প্রসারণের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠা করছে নতুন দৃষ্টান্ত। আজ কথা বলবো তেমনই এক শিল্পগোষ্ঠী—আবুল খায়ের গ্রুপ এর সম্পর্কে—যারা প্রতিকূলতার মাঝেও নিজেদের ব্যবসায়িক পরিধি বাড়িয়ে চলেছে।

বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে অনেকেই যখন অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল অবস্থান নিচ্ছেন, তখন কীভাবে আবুল খায়ের গ্রুপ নতুন খাতে নিজেদের বিস্তৃত করছে? কী তাদের পরিকল্পনা, আর কীভাবেই বা তারা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে?

সম্প্রতি, আবুল খায়ের গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনের খাতে প্রবেশ করেছে। স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড নামে নতুন একটি কোম্পানির মাধ্যমে এই খাতে যাত্রা শুরু করেছে তারা।

এছাড়া, ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে, আবুল খায়ের গ্রুপ দুটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করেছে। সেগুলো হলোঃ

ইগলু সুগার এবং
গ্লোব এডিবল অয়েল লিমিটেড

এই দুটি অধিগ্রহণের মোট মূল্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ইগলু সুগার অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ১,৭০০ কোটি টাকা এবং গ্লোব এডিবল অয়েল লিমিটেডের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে।

এই অধিগ্রহণের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। আব্দুল মোনেম গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে চিনিকলটি পরিচালনা করছিল, কিন্তু ক্রমাগত লোকসানের কারণে তারা এটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

গ্রুপের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন—
“চিনি বাজারে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে, কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় আমরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছিলাম না।”

অন্যদিকে, গ্লোব এডিবল অয়েল লিমিটেড কেবল ভোজ্যতেল উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিষ্ঠানটি কার্বোনেটেড বেভারেজ, বিস্কুট, এবং ডেইরি পণ্য বাজারজাত করছিল। জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম ইউরো কোলা এবং টাইগার সফট ড্রিংকস। তবে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি সূচনা। আবুল কাশেম আরও কিছু প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করছেন, বিশেষত খাদ্য, পানীয়, এবং বিস্কুট শিল্পের বিভিন্ন খাতে তার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে চান। যেখানে মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ এবং টিকে গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে, সেখানে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করাই এখন তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আবুল খায়ের সাহেবের বড় ছেলে আবুল কাশেম, যিনি ১৯৭৮ সালে বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর ব্যবসার দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বেই এই গ্রুপটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে, প্রতিষ্ঠানটি সিমেন্ট, স্টিল, দুগ্ধজাত পণ্য, চা, এবং কনডেন্সড মিল্ক—এই সবগুলো খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের কিছু পরিচিত ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে—

শাহ ব্র্যান্ড (সিমেন্ট)
একেএস (স্টিল)
মার্কস ফুল ক্রিম পাউডার (ডেইরি পণ্য)
সিলন (চা)
স্টারশিপ (কনডেন্সড মিল্ক ও খাদ্যপণ্য)

বর্তমানে গ্রুপের বার্ষিক বিক্রয় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে তুলেছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, আবুল খায়ের গ্রুপ নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের শিল্প খাতের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভবিষ্যতে তারা আরও নতুন খাতে প্রবেশ করবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *